সিলেটের কথা ::: রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার আগে ধর্ষণ করেন প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা। এই বর্বরোচিত অপরাধের সময় তার সঙ্গে আরও একজন সহযোগী ছিলেন বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতের জবানবন্দিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে হাজির করা হলে আসামি সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জড়িত তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রামিসাকে ধরে এনে ধর্ষণ ও হত্যার সময়ে সোহেল রানা নিজের ঘরের একটি কক্ষে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বাইরে থেকে সিটকিনি আটকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন।
পরে শিশুটির মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার প্রস্তুতির সময় রামিসার স্বজন ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের জানালার লোহার গ্রিল ভেঙে সোহেল রানা ও তার ওই সঙ্গী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। তবে স্থানীয় জনতা ঘরের ভেতর থেকে স্বপ্নাক তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
এই জঘন্য মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও বুধবার ঢাকার আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত শুনানি শেষে তাকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সোহেল ও স্বপ্নাকে দুটি আলাদা আদালতে হাজির করে পৃথক আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া রিপন। সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার কারণে তাকে নতুন করে আর রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না নিজ বাসার একটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। সেই সুযোগে সোহেল বাইরে থেকে ওই কক্ষের সিটকিনি লাগিয়ে দেন এবং রামিসাকে ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে জোরপূর্বক ধরে ভেতরে নিয়ে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে অপর এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। রামিসা চিৎকার করার চেষ্টা করলে ঘাতকেরা তার মুখ ওড়না দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে এবং বাথরুমের ভেতরে নিয়ে গিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান আরও জানান, রামিসাকে হত্যার পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে গুম করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে রামিসার পরিবার ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা নিখোঁজ শিশুর সন্ধান করতে করতে বাইরে থেকে বাসার দরজায় তীব্র ধাক্কা দিতে শুরু করেন। তারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে সোহেল ও তার সঙ্গী জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বাইরের তুমুল হৈ-হুল্লোড়ের শব্দে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখেন কক্ষের বাইরের সিটকিনি খোলা। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে রামিসার রক্তাক্ত গলা কাটা দেহ দেখতে পান। স্থানীয়রা দরজায় আঘাত করলেও স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা না খুলে নিজের স্বামী ও তার সঙ্গীকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সাহায্য করেছিলেন।
তদন্তের স্বার্থে সোহেলের সঙ্গে থাকা সেই পলাতক সহযোগীর নাম এখনই প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশ। তবে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। রামিসা হত্যা মামলায় ওই ব্যক্তিকে আপাতত ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে পেশ করা পুলিশের আবেদনে বলা হয়েছে, নিহত রামিসা রাজধানীর একটি স্থানীয় স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন।
পুলিশের সুরতহাল ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ পড়ে ছিল এবং আরেকটি কক্ষের ভেতরে একটি প্লাস্টিকের বালতির মধ্যে তার খণ্ডিত মাথা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মরদেহ সম্পূর্ণ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির মাথা শরীর থেকে আলাদা করা হয় এবং তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এ ছাড়া দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহটি বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই বর্বরোচিত ঘটনায় শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারসহ মোট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
Leave a Reply